তিন তালাক ও বাংলার মুসলমান মহিলা

তিন তালাক ও বাংলার মুসলমান মহিলা
ড. আবু সিদ্দিক
বাঙালি মুসলমানদের ‘তিন তালাক’ প্রথার বিরুদ্ধে সচেতন হওয়া দরকার, যদিও বাংলার মুসলমানদের মধ্যে তিন তালাক বা দুই তালাকের প্রবনতা দিনের পর দিন কমছে। মুসলমানদের বোঝা উচিৎ আজ আর তিন (মতভেদে দুই) তালাক প্রথা নিস্প্রয়োজন। মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড (১৯৭৩) তিন তালাকের পক্ষ সমর্থন করতে পারেন তাঁদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য। কিন্তু বাঙালি মুসলমানদের ভারতীয় নাগরিক হওয়ার সুবাদে ভারতীয় বিচার-ব্যবস্হার প্রতি শ্রদ্ধা দেখান আবশ্যীক।মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড, যার ভাষা ইংরেজী এবং উর্দু, এবং যার মাথায় আছেন জনাব Syed Mohammad Rabe Hasani সহ Qari Muhammad Tayyib Abul Hasan Ali Hasani Nadw-এর মত খ্যাতনামা আলেমগন কখনই বাঙালি মুসলমানের প্রতিনিধি হতে পারে না। আমি একশো শতাংশ বিশ্বাস করি উনারা বাঙালি মুসলমানকে চেনেন না।এই বোর্ড ভারতীয় সমাজে অনাবশ্যক বিভেদের জন্ম দেয়। শিক্ষিত সচেতন মুসলমানদের তাই শাহ বানো ও শাইরা বানো দের পাশে দাঁড়ান উচিৎ। ভারতীয় বিচার-ব্যবস্হা যেন ক্ষমতাসীন পুরুষ মুসলিমদের তোষণ না করে। একটি নারীকে তাঁর ন্যায্য সাংবিধানিক অধিকার ও মর্যাদা থেকে কেউ যেন বঞ্ছিত করতে না পারে।

মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড ইসলাম এবং সারা ভারতের মুসলমানদের, আমি আগেই বলেছি আবারও বলছি, প্রতিনিধিত্ব করে না।আরীফ মোহম্মদ খানের যুক্তিবাদী ধারনা এবং মানবাতাবাদী চেতনা আজকের মুসলমান সমাজের বড়ই প্রয়োজন। শাহ বানোর পর গঙ্গা দিয়ে জল অনেক প্রবাহিত হয়েছে। মুসলমান নারীর অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয় নি। কারন সংখ্যালঘু ধর্মীয় নেতারা সংখ্যাগুরু সমগ্র মুসলমান সম্প্রদায়ের উপর এখনও সমানতালে আল্লার এবং দোজখের অতিরঞ্জিত ভয় দেখিয়ে ‘টাইট’ দিয়ে রেখেছেন। আর যেটা সবথেকে অবাক করার কথা সেটা হল মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের কয়েকটি এলোমেলো প্রতিবাদী সূর এই গোঁড়াদের বিরুদ্ধে সময় সময় শুনা গেলেও, সংঘটিত প্রতিবাদের যুক্তিবাদি এবং মানবতাবাদী আওয়াজ সেরকম ভাবে এখনও প্রকাশ পায় না। আশার কথা সেই কাজটি এবার নজরুল ইসলামের দ্বারা শুরু হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে। আমরা অতীতে দেখেছি এবং এখনও দেখছি মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের উদার মানবতাবাদী মতামত এবং তাদের দেওয়া কুরান ও হাদিসের মননশীল ব্যাখ্যা কোনদিন বৃহত্তর মুসলমান সম্প্রদায়ের কাছে ‘পাত্তা’ পায় নি। পাত্তা পেয়েছে তথাকথিত মৌলবিদের দেওয়া কুরান ও হাদিসের বিভেদকামী ব্যাখা। আজ হেসে খেলে দিন কাটানোর সময় নয়। গভীর আত্মনুসন্ধানের দিন। আমাদের উচিৎ মুষ্টিমেয় যে সব মুসলমান (সে কতটা খাঁটি মুসলমান/ কাফের এই বিচার না করে) বৃহত্তর সমাজের কথা ভেবে এবং ইসলামের প্রগতিবাদী এবং যুক্তিবাদীতে আস্থা রাখেন, তাঁদেরকে বুকে ধরে আগলে রাখা, এবং তাদের কাজের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং সমর্থন প্রদান করা।
কিন্তু এখানে আর একটি কথা খুব স্পষ্ট করে বলা দরকার। তালাক প্রথাই একমাত্র মুসলমান মহিলাদের পিছিয়ে রাখেনি। মুসলমান মহিলারা আরও নানাদিক হতে বঞ্চিত ও ‘অচ্ছুৎ’। এবং এর জন্য বৃহত্তর নাগরিক সমাজ এবং রাষ্ট্র দায়ী একথা ভুলে গেলে চলবে না। দুঃখের বিষয় তালাক নিয়ে সকালে বিকালে রকমারি সুস্বাদু ভুরি ভুরি লেখা বেরুয়। তালাকের ইস্যুকে সামনে রেখে গলি থেকে রাজপথ আমরা দাপিয়ে বেড়াই। কিন্তু মুসলমান মহিলাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি সম্পর্কে আমরা ভীষণভাবে মুখে কলুপ আঁটি। বোরখা, তালাক ছাড়া আর কি কিছু মুসলমান মহিলাদের পাবার নেই? তাহলে মুসলমান মহিলাদেরকে ‘বোরখা, তালাক’-এর গণ্ডী পেরিয়ে একটু একপেশেভাব কাটিয়ে নিজেদের আলস্যকে বিদায়দিয়ে চোখে টাটকা ঠাণ্ডা জলের ঝাপটা দিয়ে দেখলে কেমন হয়!মানুষের মুক্তির প্রধান এবং প্রাথমিক সোপান শিক্ষা। যে শিক্ষা থাকলে মুসলমান মহিলারা তালাকের প্রথা কে ভোঁতা করে দিতে পারেন নিজেরাই। সেই শিক্ষার ক্ষেত্রে মুসলমান মহিলাদের পশ্চাদপদতার জন্য কে বা কারা দায়ী? মুসলমানরা নয় নিশ্চয়। মুসলমান মহিলাদের সামগ্রিক শিক্ষাগত অবস্থানের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় দারিদ্র্য, কাছাকাছি বিদ্যালয়ের অভাব, দূরের স্কুলে পাঠানোর ক্ষেত্রে নিরাপত্তাজনিত সমস্যা, গ্রামীণ পশ্চাদপদ অংশে স্কুলের দুর্দশা, মেয়েদের পৃথক স্কুলের অভাব, মহিলা শিক্ষিকার অভাব, শিখান্তে পেশাপ্রবেশের সম্ভবনা কম, ইত্যাদি। মুসলমান মহিলাদের কথা বলতে শুধু তাঁদের বিবাহ, সন্তান জন্ম দেওয়া, তালাক, ইত্যাদি বিষয়গুলোই প্রাধান্য পায়।চেনা ছকের বাইরে পা দিলে বাংলা তথা ভারতের মুসলমান মহিলাদের পিছিয়ে পড়ার কারন একমাত্র পর্দা ও তালাক নয় সেটা সাচার রিপোর্ট, স্ন্যাপ রিপোর্ট (পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান মহিলাদের ক্ষেত্রে) চোখে আঙুল দিয়ে বার বার প্রমাণ করে।

Advertisements